দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে: বিপিসি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল কিনতে ক্রেতার অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। অনেকেই আগেভাগে মজুতের আশঙ্কায় ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে তেল নিচ্ছেন। ক্রেতার চাপে কোথাও কোথাও বিক্রি সাময়িক বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে। তেল ডিপোগুলোতেও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ ডিজেল বিক্রি হয়েছে।
পরিস্থিতি সামলাতে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বিপিসি। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি তেল নিয়ে একাধিক জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে। আরও জাহাজ আসছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রেও অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। মালিবাগ, তেজগাঁও, আসাদগেট, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ চালক ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে তেল নিচ্ছেন। ফলে কিছু পাম্পে মজুত দ্রুত কমে গেছে।
মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার চৌধুরী ফিলিং স্টেশনে রাইড শেয়ারিং চালক ইকবাল বলেন, সাধারণত দিনে দুই থেকে তিনবার অকটেন নেন। কিন্তু লোকজন বলছে, দুদিন পর তেল পাওয়া যাবে না। তাই পুরো ট্যাঙ্ক ভরেছেন। এই পাম্পের ম্যানেজার নজরুল আলম বলেন, সাধারণত তাদের কাছে ২০ থেকে ২৭ হাজার লিটার তেল মজুত থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদায় তা দ্রুত কমে গেছে। তাই আপাতত শুধু গাড়িতে তেল দেওয়া হচ্ছে।
নিউমার্কেট এলাকার একটি পাম্পের কর্মীরা জানান, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত গাড়ির চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ ছিল। মজুত কমে যাওয়ায় গতকাল বেলা ১০-১১টার পর অনেক পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশনের কর্মী আমিনুল গতকাল দুপুরে বলেন, ডিপো থেকে গাড়ি আসছে না। মজুত কমে গেছে। তাই বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
শত শত ট্যাঙ্ক-লরির দীর্ঘ সারি
সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গোদনাইল এলাকায় পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপোতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শত শত ট্যাঙ্ক-লরির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় ডিপোর ভেতর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ট্যাঙ্ক-লরির লাইন নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল সড়কে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরের পর সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সড়কে তীব্র যানজট দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় পেট্রোল পাম্প মালিক ও এজেন্টরা বেশি করে তেল সংগ্রহ করতে লরি নিয়ে ডিপোতে ভিড় করছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট হতে পারে– এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন তারা।
গোদনাইলের মেঘনা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পাম্প মালিকদের ২০ শতাংশ এবং এজেন্টদের ৫০ শতাংশ কম তেল দিতে হচ্ছে। ডিপোতে পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে; সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। তবে পরিদর্শন কার্যক্রমের কারণে সরবরাহে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ট্যাঙ্ক-লরির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।একই এলাকার পদ্মা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক আমিনুল হক বলেন, ডিপোতে তেলের মজুত স্বাভাবিক।
ডিপো এলাকায় অপেক্ষমাণ চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গাজীপুর থেকে আসা ট্যাঙ্ক-লরি চালক সুমন বলেন, সকাল ৮টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি, এখন দুপুর ১টা। কখন তেল পাব, জানি না! প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে জটে আটকে আছি। আরেক চালক বাবুল জানান, সকাল সাড়ে
৯টায় পদ্মা ডিপোতে এসে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লরির জটে আটকে পড়েছেন। তিন ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। ট্যাঙ্ক-লরি চালক আনোয়ার বলেন, যুদ্ধের কারণে তেল সংকট হতে পারে– এ আশঙ্কায় অনেকেই বেশি তেল মজুত করতে চাইছেন।
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে: বিপিসি
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন—বিপিসি। শুক্রবার (৬ মার্চ) সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটা জানানো হয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গুজব ও অপপ্রচারের কারণে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। তাই গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিপিসি জানায়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদেশ থেকে নিয়মিত আমদানি অব্যাহত রয়েছে এবং বিভিন্ন ডিপোতে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পাম্পগুলোতে নির্ধারিত সীমার মধ্যে তেল বিক্রির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৫ লিটার, প্রাইভেটকারে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ বা মাইক্রোবাসে ৩০ থেকে ৪০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল বিক্রি করা যাবে। এছাড়া ড্রাম বা কন্টেইনারে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২৫০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিপিসি আরও জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা মজুত করে রাখার চেষ্টা করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মতামত দিন
০ টি মন্তব্য