মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে যৌথভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। যদিও আরব আমিরাত ইরানের হামলার সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে, তবে তারা যদি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে ইরানের বিপক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশে নেওয়া দেশ হিসেবে নাম লেখাবে তারা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ উদ্দেশ্যে আরব আমিরাত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে, যা এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দিতে পারে। দেশটির কূটনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ও এশিয়ার সামরিক শক্তিগুলোর কাছে একটি জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালীটি খুলে দেওয়া যায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাহরাইন, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর অবস্থান করছে, এই প্রস্তাবটি পৃষ্ঠপোষকতা করছে এবং আগামী বৃহস্পতিবার সেখানে এ বিষয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো আমদানি রফতানির জন্য হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করেছে, ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যা বলেছে আরব আমিরাত
আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা জানান, প্রণালী নিরাপদ করতে তারা কীভাবে সামরিক ভূমিকা নিতে পারে তা সক্রিয়ভাবে পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যে ইরানের পাতা মাইন অপসারণসহ অন্যান্য সহায়তামূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এছাড়া, প্রণালীর কৌশলগত দ্বীপগুলো—যেমন আবু মুসা, যা বর্তমানে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আরব আমিরাতের দ্বীপটি দখল জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করার কথাও শোনা গেছে।
আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে।
আমিরাতের এই নতুন কৌশলগত অবস্থান একটি বড় পরিবর্তন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাই ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কর্মকর্তারা আরও জানান, সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে এবং তারা চায় এই যুদ্ধ চলতে থাকুক যতক্ষণ না ইরানের ইসলামি শাসন দুর্বল বা উৎখাত হয়—যদিও তারা এখনো সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়নি।
আরব আমিরাতে ইরানিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
যুদ্ধ চলাকালে আরব আমিরাতে ইরানিদের দেশটিতে প্রবেশ বা ট্রানজিট নিষিদ্ধ করেছে বলে তিনটি বড় এয়ারলাইন জানিয়েছে। এমিরেটস, ইতিহাদ এবং ফ্লাই দুবাই তাদের ওয়েবসাইটে এই নির্দেশনা প্রকাশ করেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, যাদের গোল্ডেন ভিসা (১০ বছরের আবাসন অনুমতি) রয়েছে, তারা এখনও প্রবেশ করতে পারবেন।
এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে এর আগে দুবাইয়ে ইরানিয়ান হাসপাতাল ও ইরানিয়ান ক্লাব—শাহ আমল থেকে থাকা দুটি প্রতিষ্ঠান—বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের আঞ্চলিক জোটের ইঙ্গিত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তার দেশ ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে নতুন জোট গড়ছে। তিনি বলেছেন, অতীতে আরব নেতাদের সতর্ক করলেও তারা গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু এখন তারা বিষয়টি বুঝতে পারছে।
সৌদি আরবের সতর্কবার্তা
ইরান আগ্রাসন বন্ধ না করলে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সৌদি আরবও। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ১৯ মার্চ বলেন, তাদের এবং তাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে যা তারা প্রয়োগ করতে পারে।
যদিও সৌদি আরব এখন পর্যন্ত তাদের ভূখন্ডে ইরানি আক্রমণের সরাসরি প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত রয়েছে, কারণ এতে আরও বড় আক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। তবে তাদের ধৈর্য কমে আসছে বলে মনে হচ্ছে। সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, ইরানের সঙ্গে ২০২৩ সালে পুনঃস্থাপিত কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে যে সামান্য আস্থা তৈরি হয়েছিল, তা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
ইরান সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করে দেশটির তেলভিত্তিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সূত্র: এনডিটিভি।
মতামত দিন
০ টি মন্তব্য