ডেইলি বাংলা টাইমস :
প্রকাশিত : ২০২৫-১১-১৮ ০১:১৫:৩৫
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর জুড়ে রাজউকের নকশা ও নিয়ম না মেনে অবাধে নির্মাণ হচ্ছে অবৈধ বহুতল ভবন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এসব ভবন নির্মাণে রাজউকের নেই কোন তদারকি। অভিযোগ রয়েছে ইমারত পরিদর্শকদের পকেট ভারি করে চলছে এসব কার্যক্রম, যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেন রাজউকের এই কর্মকর্তাগন।
উঁচু উঁচু অট্টালিকার শহর ঢাকা জানান দিচ্ছে উন্নত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি কিন্তু সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুসারে এসব ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও এসবের তোয়াক্কা করেন না রাজধানীর রাজউক জোন-৩ এর মিরপুর, দারুসসালম, শাহআলী, রূপনগর, পল্লবী, কাফরুল ও ভাষানটেক থানাধীন এলাকার বাড়ির মালিক গন।
ইমারত নির্মাণের নীতিমালায় বলা আছে রাস্তা হতে বাড়ির সম্মুখ অংশ ও পিছনের অংশ সহ অপর দুই পাশে কতটুকু জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণ করতে হবে, ১০তলা বা এর অধিক উচ্চতার ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগের ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক এসবের সাথে স্মোক ডিটেক্টর, ফায়ার ডিটেক্টর, ফায়ার হাইড্রেন্ট বসানোসহ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রেখে ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও রাজউক জোন ৩ এর জমির মালিক গন কেহই মানেন না এই নিয়ম নীতি। এরপর ও কিভাবে নির্মাণ হচ্ছে এসকল ভবন? তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজউকের কর্মকর্তাদের ভূমিকা কি এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেড়িয়ে আসে থলের বেড়াল এবং এ অঞ্চলের বাড়ির মালিক ও ডেভলপারদের নিকট থেকে ইমারত পরিদর্শকদের বিপুল পরিমাণ উৎকোচ গ্রহণের প্রমাণ।
জোন-৩/১ এর ভাষানটেক থানাধীন ভাষানটেক, মৈনারটেক, মাটিকাটা ও দেওয়ান পাড়া এলাকার নির্মানাধীন বহু ভবনে রাজউকের কোন আইন মানা হয়নি, এসম্পর্কে ভূমি মালিকগন ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাইট ইঞ্জিনীয়ারদের নিকট জানতে চাইলে জানান তাহারা রাজউক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বাড়ি নির্মান করছেন, আরো কিছু জানার থাকলে রাজউকের ইমারত পরিদর্শকদের সাথে কথা বলতে বলেন। সরজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, অত্র এলাকার রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মোঃ ছামিউল তাহার ব্যাক্তিগত সহকারী আল-আমিনের মাধ্যমে ভবন মালিকদের নোটিশ করে অফিসে ডেকে এনে টাকার বিনিময়ে অভিযোগ গুলো নিষ্পত্তি করেন, আর এ উৎকোচের টাকা মাঠ পরিদর্শক ছামিউল নিজে ও তাহার ব্যাক্তিগত সহকারী আল-আমিন গ্রহন করে থাকেন। এহেন নোটিশ বানিজ্যের মাধ্যমে পকেট ভারী করে যাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি উচ্ছেদের চুড়ান্ত নোটিশ হওয়া ভবন সমুহের নির্মাণকারীদের সাথে কথা বলে অফিসে ডেকে এনে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। বিনিময়ে ভবন নির্মাণকারীগণ অবাধে বিধি বহির্ভূত ভাবে নির্মাণ করেন ভবন সমূহ। আরও জানতে পারা যায় যাহাদের সাথে ছামিউলের নেগোসিয়েশন না হয় তাদের ভবনে মোবাইল কোর্ট এবং উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বৈদ্যুতিক মিটার জব্দ করে নিয়ে নুন্যতম ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পুনরায় বৈদ্যুতিক সংযোগ প্রদানের ব্যবস্থা করে দেয় অনেক ক্ষেত্রে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে।
ইমারত পরিদর্শক ছামিউল এর এলাকায় মাত্র কয়েক ঘন্টার মাঠ অনুসন্ধানে প্রায় ১০০টির ও অধিক রাজউক বিধি লঙ্ঘিত করে নির্মাণাধীন ভবন এর সন্ধান পাওয়া যায় এর মধ্যে কিছু সংখ্যক ঠিকানা দৃষ্টিগোচরের জন্য উল্লেখ করা হলোঃ ১)বাসা- ১০১/এ/২ ইডেন গার্ডেন এর সাথে যুক্ত, উঃ,ভাষানটেক, ৬ তালা ভবন; ২)১০১/এ/২, ইডেন গার্ডেন, উঃ ভাষানটেক, ১১ তালা ভবন; ৩)১০০/এ [হক ফার্মেসির অপরদিকের ভবন টি] উঃ ভাষানটেক, ৪ তালা ভবন; ৪)৯১/৪ (মালিক মসিউর রহমান), উঃ ভাষানটেক ৪ তালা ভবন; ৫)৮৯, উঃ ভাষানটেক, ১১ তালা ভবন; ৬)৮৮/১বি, উঃ ভাষানটেক, ১ তালা ভবন; ৭)৮৮/১এফ, উঃ ভাষানটেক, ১০ তালা ভবন; ৬০/২-এফ, টোনারটেক, ভাষানটেক, ১১ তালা, রাস্তা ১১ ফিট; ৮) সিএস-৭৩০/৭৪৫(আংশিক), আর-এস-১১০৯ এর পেছনের ভবন, পশ্চিম মাটিকাটা,ভাষানটেক, ১০ তালা ভবন; ৯)১৮৩/৭/বি/৫, পশ্চিম মাটিকাটা, ভাষানটেক, ৮ তালা ভবন; ১০) ৬/১ এর সামনের ভবন ভবন (মালিক: শ্রী কুমার দাস ), পশ্চিম মাটিকাটা,ভাষানটেক, ৮ তালা ভবন; ১১) ৩৩/৮ এর সামনের ভবন, পশ্চিম মাটিকাটা, ভাষানটেক, ৫ তালা ভবন; ৬৫/৩, ডিফেন্স হাউজ এর সামনের ভবন, টোনারটেক,ভাষানটেক, ২ তালা; ১২) ৬২/২ এর পাসের ভবন, টোনারটেক, ভাষানটেক, ৫ তালা ভবন; ১৩) ১১৯/১/ক, ১১৯/২/ক, মামা হোটেল রোড, পশ্চিম মাটিকাটা, ৫-৬ টি ভবন আছে এই লোকেশনে ভবনের প্লান ও নেই কিছু ভবনে, প্রতিটি ১০ তালা ভবন; ১৪) সিএস-৫৭৪, আরএস-৯২০, ৯২১, মামা হোটেল রোড, পশ্চিম মাটি কাটা,৭ তালা ভবন; ১৫) ৩৮/৮-ই, পশ্চিম মাটিকাটা, ১০ তালা ভবন; ১৬) ৩৭/৩-বি, মামা হোটেল রোড, ২ তালা ভবন; ১৭) বাসা- ৫৯/৪/বি, ৫৯/৬, কেরামত আলী রোড, পশ্চিম মাটি কাটা, ৬ তালা ভবন; ১৮) ৫৯/৫ এর সামনের ভবন, কেরামত আলী রোড, পশ্চিম মাটি কাটা, ৩ তালা ভবন; ১৯) ৫৫/ডি অগ্ৰানী আবাসন চত্বর, পুকুর পাড় রোড, মাটি কাটা, ১০ তালা ভবন; ২০) ১৭/৩/৫, দেওয়ান পাড়া রোড, পশ্চিম ভাষানটেক, ১ তালা ভবন; ২১) ১৬/১, দেওয়ানপাড়া রোড,পশ্চিম ভাষানটেক মোল্লা মার্কেট, ৯ তালা ভবন; ২২) আরএস-১৭৪২, সিএস- ৭৬১ দেওয়ানপাড়া রোড, পশ্চিম ভাষানটেক, ২ তালা ভবন; ২৩) ৮৪/১০/এ, এর সামনের ভবন, দেওয়ানপাড়া, পশ্চিম ভাষানটেক, ৬তালা ভবন; ২৪) ১৭/৬, অটো স্ট্যান্ড রোড, পশ্চিম মাটিকাটা, ১০ তালা ভবন; ২৫) ১১১, বাজার রোড মাটিকাটা, ১০ তালা ভবন; ২৬) ১১৮/৩, মাটিকাটা, ৮ তালা ভবন সহ আরও অসংখ্য ভবন।
এ বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক মোঃ ছামিউলের সহিত তাহার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি এবিষয়ে কোন বক্তব্য প্রদান করতে রাজী হয়নি।
রাজউকের নিয়ম ব্যাত্যয় করে ভবন নির্মাণ সম্পর্কে রাজউকের একজন নগর পরিকল্পনাবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন ইমারত পরিদর্শকগণ যদি সঠিক ভাবে তাহাদের দায়িত্ব পালন করতেন তবে রাজউকের ভবন নির্মাণ বিধি যথাযথ ভাবে পালন করতে ভবন নির্মাণকারীগণ বাধ্য হতেন। এতে অন্তত ৭০ ভাগ ভবন যথানিয়মেই নির্মাণ হতো। অপরিকল্পিত ভাবে নির্মিত ভবন সমুহের প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হবে যখন দেশে ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হবে, আর এর ভয়াবহতা হবে ভয়ংকর ও ক্ষয়ক্ষতি হবে অপরিসীম।
ইমারত পরিদর্শক মোঃ ছামিউলের অনিয়ম ও দুর্ণিতীর অভিযোগ সম্পর্কে রাজউক জোন ৩/১ এর অথরাইজড অফিসার এফআই আশিক আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ইমারত পরিদর্শকদের হাতে অনেকটাই জিম্মি, আমরা তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি, তাহারা তথ্য গোপন করলে আমাদের কিছুই করার থাকে না। তবে, আপনাদের অভিযোগ ও নিউজের মাধ্যমে আমরা অনেক বিষয় জানতে সক্ষম হই এজন্যে আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। ইমারত পরিদর্শক মোঃ ছামিউলের বিষয়ে উপস্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো শীঘ্রই।
রাজধানীতে ভবন নির্মাণে বিভিন্ন ত্রুটির কারণে কাঁদতে হয় ভবনে বসবাসকারীদের। এরপরেও ছামিউলের মত রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় রাজউককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ সকল অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। এলাকাবাসীরা জানান, রাজউক বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে শুধু ভবন মালিকদের নয় রাজউকের সংশ্লিষ্ট ইমমারত পরিদর্শক ছামিউল এর উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন।