শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ২০২২ সাল থেকে আটকে থাকা অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবসর ভাতার বকেয়া আগামী দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বুধবার সকালে আসন্ন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত চার শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
রাজধানীর আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ অডিটোরিয়ামে এই সভার আয়োজন করা হয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ মো. আক্তারুজ্জামানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান।
শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সংকট ও সংস্কারের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘২০২২ সাল থেকে যারা অবসরে গিয়েছেন, তারা একজনও এখন পর্যন্ত অবসর ভাতার টাকা পাননি। একজন শিক্ষক অবসর গ্রহণের পর ২৫ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। বিগত সরকারের সময় এই ফান্ডের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফলে হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাদের শেষ জীবনে এসে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।’
শিক্ষকদের এই ন্যায়সঙ্গত অধিকার দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ড. এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই মানবিক সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি। আসন্ন জুলাইয়ের বাজেটে এই খাতের জন্য অতিরিক্ত ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া এ খাতের জন্য একটি বিশেষ বন্ড পেয়েছি। আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এই ভাতা বিতরণ শুরু হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে শিক্ষকদের সমস্ত পাওনা পরিশোধ করে এই জট দূর করা হবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আদালতে শুধু একটি মামলার কারণে আমরা ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারিনি। এর মধ্যে আরও ১৭ হাজার শিক্ষক অবসরে গেছেন। ৬০ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। বিগত সরকারগুলো কেন এই সমস্যা সমাধান করেনি? মামলার জট দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আটকে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, সাউথ আফ্রিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা আছে- ‘একটি জাতিকে ধ্বংস করতে নিউক্লিয়ার বোমার দরকার হয় না, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই সেই জাতি ধ্বংস হয়ে যায়’। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সুপরিকল্পিতভাবে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু নতুন বাংলাদেশে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি বরদাশত করা হবে না।
শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করেছিলেন। আমরা চাই মেধাবী শিক্ষকেরা যেন এই পেশায় ধরে থাকেন। তাই সরকারি পে-স্কেলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি শিক্ষকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়, সে বিষয়েও সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’
ড. এহছানুল হক মিলন জানান, বিগত সরকারের আমলে শিক্ষার বাজেট ছিল জিডিপির মাত্র ১.৩৯ শতাংশ (৮৭ হাজার কোটি টাকা)। বর্তমান নতুন নেতৃত্বের অধীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষার বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে বিশাল বাজেট ধারণ করার সক্ষমতা আমাদের তৈরি করতে হচ্ছে। তারপরও এবার আমরা ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেয়েছি। এই বাজেট দিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মিড-ডে মিল ও কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পরিমার্জিত নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বই প্রস্তুত করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।’
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জুতা, মোজা, ব্যাগ ও ড্রেস দেওয়া হবে। যাতে তারা আনন্দময় পরিবেশে শিখতে পারে। শিক্ষকদের ট্যাবলেট এবং স্মার্ট ক্লাসরুম দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তারা সঠিকভাবে ক্লাস পরিদর্শন করছেন কিনা, তা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমেই তদারকি করা হবে। দায়িত্ব অবহেলা করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
মতবিনিময় সভায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানবৃন্দ, পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ এবং জেলা ও উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মতামত দিন
০ টি মন্তব্য