বিস্তীর্ণ ফসলী মাঠের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা সরু-গভীর খালের স্বচ্ছ পানি কয়েক দশক আগের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় কৃষক রুহুল আমিনকে। আশির দশকে বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতে এসে এমন দৃশ্য দেখেছে। আবেগাপ্লুত রুহুল আমিন নিজের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ম্যালা আগে ইহেন দিয়ে জোলা আচিল, তারপর বুইজ্যা গেছিল। এই জোলা নতুন কইর্যা খোঁড়ায় পানি বের হইয়্যা যাইবো, আমরা ধান, পাট, সর্ষে তিন ফসল আবাদ কইরতে পারমু।ইনশাল্লাহ-আমাগোরে ইহ্যানকার কৃষকগোরে আর অভাব থাইকপো না।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মানতার বিল এলাকায় রুহুল আমিনের মতো একাধিক কৃষক উচ্ছসিত, আনন্দিত।
একটি সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা, যা বদলে দিয়েছে তাদের ভাগ্য-আর এটাই তাদের উচ্ছাসের কারণ। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত খাল খনন প্রকল্পের আওতায়, মানতার বিল থেকে বাগলপুর পর্যন্ত এক হাজার ৪৩২ মিটার খাল খননে চার মৌজার হাজারো কৃষককে এনে দিয়েছে নতুন স্বপ্ন।
অপরদিকে একই উপজেলায় ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের স্বরস্বতী নদী খননেও পাল্টে গেছে পাটধারী ও ধোপাকান্দি এলাকার চিত্র। সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে এ অঞ্চলের কৃষকেরাও।
মাত্র তিন দশমিক ৪৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুটি খাল খননে কেটেছে পাঁচ ইউনিয়নের ২০ হাজার একর জমির জলাবদ্ধতা। যেসব জমিতে বছরে একবারের বেশি ফসল চাষ হতো না, সেই জমিতে তিনটি ফসল ফলাতে পারবে কৃষক।
কয়ড়া বাগলপুর গ্রামের কৃষক মো. আব্দুল আলিম ও মকবুল হোসেনসহ একাধিক কৃষক জানায়, পানি নিস্কাশনের পথ না থাকায় মানতার বিলের অভ্যন্তরে ভদ্রকোল, খালিয়াপাড়া, বাগলপুর ও শ্যামপুর এই চারটি মৌজার প্রায় ৯০০ বিঘা জমি বছরের ৮ মাস জলাবদ্ধ থাকতো। শুধুমাত্র বোরো মৌসুমে ধান চাষ করা যেত, জলাবদ্ধতার কারণে সেই ধান কেটে ঘরে তুলতে নানা বিড়ম্বনায় পড়তো কৃষকেরা। কয়েক দশক আগে বিলের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ থেকে যায় এই ৯০০ বিঘা জমি।
প্রধানমন্ত্রী ঘেঁষিত খাল খনন প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ওই মৃতপ্রায় খালটি খননের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস। একই সঙ্গে উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নে দখলে দূষণে মৃতপ্রায় সরস্বতী নদীটিও খনন কাজ শুরু করা হয়। এক কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মাত্র এক মাস ১২ দিনেই ৩ দশমিক ৪৩২ কি.মি খাল দুটি খনন করা হয়। আর এ দুটি খাল খননে কয়ড়া, উল্লাপাড়া সদর, দুর্গানগর, হাটিকুমরুল ও বড়হর ইউনিয়নের অন্তত ২০ হাজার একর জমির জলাবদ্ধতা নিরসন হয়েছে। ফলে কৃষকেরা বছরে বোরো ধান, পাট, সরিষা, শীতকালীন সবজিসহ নানা ফসল আবাদ করতে পারবে। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের অভাব দূর হবে।
উল্লাপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত প্রকল্পের আওতায়, মানতার বিল থেকে বাগলপুর পর্যন্ত খাল খনন হয়েছে। এই বিলে তিন ইউনিয়নের পানি নামতো, ফলে বৃষ্টি হলেই কৃত্রিম বন্যা হতো। এখন আর সেটা হবে না। খাল দিয়ে পানি ফুলজোড়ের শাখায় পতিত হবে। অপরদিকে হাটিকুমরুলে স্বরস্বতী নদী ২ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। দুটি খাল খননে ৫ ইউনিয়নের ২০ হাজার একর জমির জলাবদ্ধতা কেটেছে। এখন তিনটি ফসলই কৃষকেরা উৎপাদন করতে পারবে। সেই সঙ্গে মাছের উৎপাদনও বাড়বে। এতে কৃষকেরাও স্বাবলম্বী হবে এবং দেশের খাদ্য সংকটও দুর হবে।
জেলার শাহজাদপুর উপজেলার মশিপুর এলাকায় ফুলজোড় নদী থেকে বের হওয়া মৃতখালটি খননের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। দুই হাজার ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের খালটি খনন শেষ হলে মশিপুরসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের ফসলী জমিতে সরাসরি ফুলজোড় নদীর পানি পড়বে। আবার বন্যা শেষে ওইসব জমির পানি দ্রুত নিস্কাশিত হয়ে ফের ফুলজোড়ে পতিত হবে।
শাহাজদুপর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, অত্যন্ত ঘনবসতি এলাকায় দুই হাজার ১৫০ মিটার খাল খননের কাচ চলেছে। এটি খননের ফলে ৩০০ একর জমি জলাবদ্ধ মুক্ত হবে। ইতিমধ্যে ৮২ শতাংশ শেষ হয়েছে। আশা করছি জুন মাসেই কাজ শেষ হবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইমলাম বলেন, জেলার দুটি উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার খাল খননে অসংখ্য কৃষক উপকৃত হবে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ বলেন, উল্লাপাড়ার সরস্বতী ও মানতার বিল দুটি খাল খনন দেখে ভালো লেগেছে। এ খাল খনন অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। অন্যান্য জায়গাতেও হয়েছে তবে উল্লাপাড়ায় আরও সুন্দর হয়েছে। বাকি আরও ১৪ কিলোমিটার যদি খনন করা যায়, তাহলে নৌ চলাচলও সম্ভব হবে।
এছাড়াও বিএডিসি (ক্ষুদ্র সেচ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন এলাকায় খাল খনন প্রকল্পের প্রস্তাবনা দিয়েছে। তবে ওইসব প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মতামত দিন
০ টি মন্তব্য