যুবদল কর্মী ইউসুফ হত্যা
রাজধানীর কাফরুল থানা এলাকায় যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলীকে (৪৫) গুলি করে হত্যার রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত শ্যুটারসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ। প্রতিপক্ষকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকা চুক্তিতে পেশাদার খুনি ভাড়া করেছিলেন তিনি।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও গ্রেপ্তারদের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. নাহিদ হাসান (২১), মো. শাফিন আহমেদ (২২), মো. জিয়ারুল মোল্লা (৩৯), মো. আলী হোসেন (৪৫), মো. জিহাদ মোল্লা (৩০), মো. মাসুম বিল্লাহ (২৮) ও মো. আবির হাওলাদার (২৫)।
ডিবির মিরপুর বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত সোয়া ১১টার দিকে কাফরুল থানাধীন ওপেক্স গার্মেন্টসের দক্ষিণ পাশের লিংক রোডের মাথায় কয়েকজন অস্ত্রধারীর ছোড়া গুলিতে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী ছাড়াও সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মো. মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ইউসুফ আলীকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ নালাম সরদার ও মনির হোসেন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পরপর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে অস্ত্রসহ এক সন্ত্রাসীকে আটক করে কাফরুল থানায় সোপর্দ করে স্থানীয় জনতা। পরবর্তীতে পুলিশ তার দেহ তল্লাশি করে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহত ইউসুফ আলীর বড় ভাই বাদী হয়ে পরবর্তীতে কাফরুল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এদিকে মামলার পরপরই ডিএমপির গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগ ও কাফরুল থানা পুলিশ চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার (২৫ জুলাই) গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের একটি দল মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আসামি মো. নাহিদ হাসান ও মো. শাফিন আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাগুরা জেলার শালিখা থানার আড়পাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপর আসামি জিয়ারুল এবং রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মো. আলী হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া তদন্তের ধারাবাহিকতায় শরীয়তপুর জেলায় অভিযান চালিয়ে আসামি মো. জিহাদ মোল্লা ও যশোর জেলার বাগারপাড়া এলাকা থেকে মাসুম বিল্লাহকে গ্রেপ্তার করে কাফরুল থানা পুলিশ। সেই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত মো. আবির হাওলাদারকে গণপিটুনির পর কাফরুল থানায় সোপর্দ করে স্থানীয়রা।
ডিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানায়, মূল পরিকল্পনাকারী হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ নিজের প্রতিপক্ষ হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকায় পেশাদার খুনি ভাড়া করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে গত ২৯ জুন পেশাদার খুনি হাসান, জিয়ারুল, চঞ্চল, জিহাদসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২ থেকে ৩ জন ঢাকায় এসে সিএনজি হাফিজের সঙ্গে বৈঠক করে। পরবর্তীতে তারা মিরপুর-১০ এলাকার বৈশাখী হোটেলের ৭১৪ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেয় এবং পরে সিএনজি হাফিজের গ্যারেজে একত্রিত হয়।
ওই সময় আবির হাওলাদারের কাছ থেকে হাফিজের ম্যানেজার নাহিদ দু’টি পিস্তল গ্যারেজে নিয়ে আসে। তবে হাফিজ অস্ত্রে গুলি লোড করার সময় একটি পিস্তল থেকে আকস্মিকভাবে মিসফায়ার হয়। এর ফলে ওইদিন হত্যার পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়। তবে সেদিন অভিযুক্তরা টার্গেট করা হাফিজুল ইসলাম বাবুর অফিসের আশপাশে গিয়ে তাকে শনাক্ত করে এবং সিএনজি হাফিজের কাছ থেকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যায়।
পরবর্তীতে গত ২২ জুলাই সিএনজি হাফিজের নির্দেশে তারা আবারও ঢাকায় আসে এবং মিরপুর-২ এলাকার সোনালী হোটেলের ৬০৮ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেয়। এর পরদিন ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সবাই আবারও সিএনজি হাফিজের গ্যারেজে একত্রিত হয়। এরপর সেখানে নাহিদের কাছ থেকে জিহাদ দু’টি লোড করা পিস্তল নিয়ে একটি জিয়ারুল এবং অপরটি চঞ্চলের কাছে হস্তান্তর করে। পরে জিয়ারুল, চঞ্চল, হাসান, জিহাদ, মাসুম বিল্লাহসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২ থেকে ৩ জন হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। এছাড়া সিএনজি হাফিজের কর্মচারী শাফিন এবং জিয়ারুলের আত্মীয় আলী হোসেন ঘটনাস্থল রেকি, আসামিদের পালিয়ে যেতে সহায়তা এবং ঘটনার পর পুলিশের তৎপরতা ও এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে।
ডিবি সূত্রে আরও জানা যায়, ঘটনার রাতে হাফিজুল ইসলাম বাবু নিজের কার্যালয়ের সামনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। ওই সময় অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিকে সন্দেহ হলে তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। একপর্যায়ে তাদের দেহ তল্লাশি করার চেষ্টা করলে অভিযুক্তদের একজন পিস্তল বের করে গুলি চালায়। এতে যুবদল কর্মী ইউসুফ বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মতামত দিন
০ টি মন্তব্য